![]() |
| Advertisement |
ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলা
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শহর বাগেরহাটে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা, যা মুসলিম স্থাপত্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে এই মসজিদটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। ষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, এটি বাংলাদেশ এবং উপমহাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য শিল্প ও ইসলামী ঐতিহ্যের এক অসাধারণ নিদর্শন।
নির্মাণ এবং প্রতিষ্ঠা
ষাট গম্বুজ মসজিদটি ১৫শ শতকে নির্মাণ করেছিলেন খান জাহান আলী। খান জাহান আলী ছিলেন তৎকালীন মুসলিম শাসক এবং সুলতানি আমলে এই অঞ্চলের ধর্ম প্রচারক ও নেতা। তিনি খলিফা বা পীর হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, খান জাহান আলী সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের সেনাপতি ছিলেন এবং তার অধীনে কাজ করতেন। বাগেরহাট শহরকে তিনি তার ধর্মীয় ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন এবং এই শহরের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। ষাট গম্বুজ মসজিদটি খান জাহান আলীর অন্যতম বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্প ছিল।
স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য
ষাট গম্বুজ মসজিদের মূল বৈশিষ্ট্য হল এর বিশাল আকৃতি এবং গম্বুজের অনন্য ডিজাইন। মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০ ফুট এবং প্রস্থ ১০৮ ফুট। এর ভেতরের অংশটি ৭টি সারি এবং ১১টি কলাম দ্বারা বিভক্ত। পুরো মসজিদটি ৮১টি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত, যা সাধারণত ষাট গম্বুজ নামে পরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে গম্বুজ সংখ্যা ষাটের চেয়ে বেশি। এই গম্বুজগুলো টেরাকোটা এবং ইটের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে।
মসজিদের ছাদে ৭৭টি ছোট গম্বুজ এবং চার কোণায় বড় ৪টি গম্বুজ রয়েছে। ভেতরের ছাদে ৬০টি খিলান রয়েছে, যা মসজিদের নামকরণের কারণ হতে পারে। মসজিদের বাইরের দেয়ালগুলো পুরু এবং স্থাপত্যে বিশেষ বৈশিষ্ট্য যুক্ত করেছে। দেয়ালে ক্যালিগ্রাফি এবং খোদাই কাজের নিদর্শন আছে, যা সেই সময়ের মুসলিম স্থাপত্যের নিখুঁত দক্ষতা প্রকাশ করে।
ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
ষাট গম্বুজ মসজিদ তৎকালীন সময়ে শুধু নামাজ আদায়ের স্থান ছিল না, বরং এটি ইসলাম প্রচারের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। খান জাহান আলী ধর্মীয় সম্প্রদায়কে একত্রিত করে মুসলিম সভ্যতা এবং সংস্কৃতির বিকাশে ভূমিকা রেখেছিলেন। এই মসজিদটি তার সময়ে একটি কেন্দ্রীয় মাদ্রাসা হিসেবে কাজ করত, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামিক আইন এবং সাহিত্য শিক্ষাদান করা হতো। মুসলিম শাসনকালে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রধান কেন্দ্র ছিল এই মসজিদটি।
ঐতিহাসিক এবং পর্যটন মূল্য
ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশে অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিবছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক এই মসজিদটি দেখতে আসেন। মসজিদটির নির্মাণ শৈলী, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে আকৃষ্ট করে। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে এই মসজিদের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংরক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা
ষাট গম্বুজ মসজিদ অনেক পুরানো হওয়ার কারণে এটি কিছুটা ঝুঁকির সম্মুখীন। তবে বাংলাদেশ সরকার এবং ইউনেস্কোর যৌথ প্রচেষ্টায় এই স্থাপনাটির রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সংরক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে মসজিদটি ধীরে ধীরে সংস্কার করা হচ্ছে, যাতে এর ঐতিহাসিক গঠন এবং নান্দনিকতা অটুট থাকে।
ষাট গম্বুজ মসজিদ শুধু বাগেরহাট নয়, সমগ্র বাংলাদেশের একটি মহৎ ঐতিহ্যবাহী স্থান, যা প্রতিনিয়ত বাংলাদেশি জনগণ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে চলেছে।




0 Comments: